তথ্য প্রযুক্তি

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ১ কি? বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের সুবিধাসমূহ

বর্তমানে আমরা প্রায় প্রত্যেকেই স্যাটেলাইট সম্পর্কে শুনেছি। স্যাটেলাইটকে কৃত্তিম উপগ্রহ হিসেবেও উল্লেখ করা যায়। ১৯৫৭ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন সর্বপ্রথম সফলভাবে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করে। সেই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশও সফলভাবে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করে। এই আর্টিকেলে আমরা বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ১ এর বিস্তারিত জানার চেষ্টা করবো। আমরা জানার চেষ্টা করবো স্যাটেলাইট কি, এর কাজ কি এবং এর নানাবিধ সুবিধাসমূহ।

 

স্যাটেলাইট কি

স্যাটেলাইট এমন একটি বস্তু যেটি অন্য একটি বস্তুকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকে। এক্ষেত্রে বলা যায় তাহলে পৃথিবী একটি স্যাটেলাইট কারণ পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। চাঁদ একটি স্যাটেলাইট কারণ চাঁদ পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। 

 

হ্যাঁ এই সবই হলো স্যাটেলাইট। কি অবাক হচ্ছেন, ভাবছেন এমনতো কখনো শুনিনি। হ্যাঁ এটাই সত্যি এগুলো স্যাটেলাইট তবে প্রাকৃতিক স্যাটেলাইট। 

 

কিন্তু কেউ যখন স্যাটেলাইটের কথা বলে তার মানে সে মানবসৃষ্ট স্যাটেলাইটের কথা বলে। মানুষের তৈরি স্যাটেলাইট হলো মানুষের তৈরি একটি মেশিন। এই মেশিনগুলি মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হয় এবং এটি মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে থাকে। 

 

বর্তমানে মানুষের তৈরি হাজার হাজার স্যাটেলাইট রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ১। কোনো কোনো স্যাটেলাইট সৌরজগতের বিভিন্ন ছবি তুলে থাকে। আবার কোনো কোনো স্যাটেলাইট সূর্য এবং গ্রহের মত বিভিন্ন বস্তুর ছবি তুলে থাকে। 

 

এই ছবিগুলি বিজ্ঞানিদের পৃথিবী, সৌরজগত এবং মহাবিশ্ব সম্পর্কে জানতে সাহায্য করে। অন্যান্য স্যাটেলাইটগুলি আমাদের টিভি সিগন্যাল এবং ফোনকলের সিগন্যাল পাঠায়। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ১ ও আমাদের টিভি সিগন্যাল এবং ফোনকলের জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

 

 

 

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ১ কি

এতক্ষণে নিশ্চয় বুঝতে পারছেন স্যাটেলাইট কি, এখন চলুন জেনে নেই বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ১ সম্পর্কে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ১ হলো বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রীয় কৃত্তিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট। এটি জাতীর পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সম্মানে নামকরণ করা হয়েছে। 

 

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ১ এর প্রকল্পটি বাংলাদেশ সরকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৫ সালে উদ্বোধন করেন। এটি এই দেশের জনগণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি পকল্প হিসেবে বিবেচিত করা হয়। এই প্রকল্পটির মাধ্যমে বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে নিজস্ব স্যাটেলাইট উৎক্ষেপনকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের নাম যোগ হয়। 

 

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট টি মাল্টিফাংশনাল হিসেবে তৈরি করা হয় যেটা বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়। যেমন বিভিন্ন দূর্গম অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা, জনগণের জন্য শিক্ষার প্রচার, গবেষনা কাজ, সচেতনতা ইত্যাদি কাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

 

 

 

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ১ উৎক্ষেপণ

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ১ এটি ২০১৮ সালের ১১ ই মে কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়। এই প্রকল্পটি বাংলাদেশ ডাক ও টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন বিভাগ দ্বারা বাস্তবায়ন করা হয়। 

 

 

  1. সর্বপ্রথম ২০০৮ সালে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) স্যাটেলাইট নির্মাণ বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করে। 

  2. ২০০৯ সালে জাতীয় তথ্যপ্রযুক্তি নীতিমালায় রাষ্ট্রীয় স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের বিষয়টি যুক্ত করা হয়।

  3. ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিটের কাছে বাংলাদেশ ইলেকট্রনিক আবেদন করে।

  4. ২০১২ সালে প্রকল্পের মূল পরামর্শক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান স্পেস পার্টনারশিপ ইন্টারন্যাশনাল কে নিয়োগ দেওয়া হয়। 

  5. ২০১৭ সালে বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড নামে একটি সংস্থা গঠন করা হয়। এই সংস্থার মাধ্যমে স্যাটেলাইট নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। 

  6. পরিশেষে ২০১৮ সালে সফলভাবে স্যাটেলাইটটি প্রেরণ করা হয়।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট এর বিবরণ

এই স্যাটেলাইটটি ১১৯.১’ পূর্ব দ্রাঘিমার ভূস্থির স্লটে স্থাপিত হয়। এটি ফ্রান্সের থ্যালিস অ্যালেনিয়া স্পেস কর্তৃক নকশা ও তৈরি করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ১ ১-১৬০০ মেগাহার্টজ ক্ষমতাসম্পন্ন মোট ৪০টি কে-ইউ এবং সি- ব্যান্ড ট্রান্সপন্ডার বহন করতে পারে। 

 

স্যাটেলাইটটির বাহিরের অংশে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকার রঙের নকশর উপর ইরেজিতে লেখা রয়েছে বঙ্গবন্ধু ১। বাংলাদেশ সরকারের একটি মনোগ্রামও সেখানে রয়েছে।

 

 

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট কোন দেশের তৈরি

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটটি বাংলাদেশের জন্য তৈরি করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে মার্কিন প্রতিষ্ঠান স্পেস এক্স এর সর্বাধুনিক রকেট ফ্যালকন-৯ স্যাটেলাইটটিকে নিয়ে কক্ষপথের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। সেখানে তথ্য ও যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক উপস্থিত ছিলেন।

 

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট এর মেয়াদকাল

এই বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ১ এটি কমপক্ষে ১৫বছর ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়েছে। উৎক্ষেপণের সময় থেকে এই স্যাটেলাইটের মেয়াদকাল ১৫ বছর হলেও এটির মেয়াদ আরো তিন বছর বাড়িয়ে ১৮ বছরে সম্প্রসারিত করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন এর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

 

স্যাটেলাইট এর নির্মাণ ব্যয়

সরকারি ওয়েবসাইটের একটি তথ্যমতে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মাধ্যমে বাংলাদেশে সম্প্রচার ও টেলিযোগাযোগ সেবা পরিচালনার জন্য ২০১৪ সালে সেপ্টেম্বর মাসে একটি সভায় দুই হাজার ৯৬৮ কোটি টাকা বরাদ্ধ দেওয়া হয়। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়া হয় ৩১৫কোটি ৫১ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয়ের ৪৪ শতাংশ। 

 

এছাড়া বিডার্স ফাইন্যান্সিং এর মাধ্যমে এই প্রকল্পের জন্য এক হাজার ৬৫২ কোটি ৪৪লাখ টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে হংকং সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশনের সাথে সরকারের প্রায় একহাজার ৪০০কোটি টাকার ঋণচুক্তি হয়। 

 

২০১৪সালের ডিসেম্বর মাসে রাশিয়ার সংস্থা ইন্টারস্পুটিনিকের কাছ থেকে অরবিটাল স্লট অনুমোদন দেওয়া হয়। এর অর্থমূল ২১৮কোটি ৯৬ লাখ টাকা।

 

 

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ১ এর সুবিধা

এতক্ষন আমরা বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট সম্পর্কে জানার চেষ্টা করলাম। এই স্যাটেলাইটের মাধ্যমে আমরা নানাভাবে সুবিধাও ভোগ করছি। এবার চলুন দেখে নেওয়া যাক এই স্যাটেলাইটের কিছু সুবিধাসমূহ:

 

স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বর্তমানে যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক সহজতর হয়েছে। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে অনেক দূর্গম জায়গাতেও আমরা যোগাযোগ অব্যহত রাখতে পারছি। প্রাকৃতিক দূর্যোগ হলে যেখানে অপটিক্যাল ফাইবার অকেজো হয়ে যায় সেখানে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে যোগাযোগ করা সম্ভব। 

 

এছাড়া ইন্টারনেটের ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। স্যাটেলাইটটি ৪০টি ট্রান্সপন্ডারের মোট ফ্রিকুয়েন্সি ক্ষমতা প্রায় ১হাজার ৬০০মেগাহার্টজ। এই ব্যান্ডউইথ ও ফ্রিকুয়েন্সি ব্যবহার করে ইন্টারনেট বঞ্চিত অঞ্চল যেমন পার্বত্য ও হাড় এলাকায় উচ্চ গতিসম্পন্ন ইন্টারনেট সার্ভিস দেওয়া সম্ভব। 

 

টিভি চ্যানেগুলি তাদের সম্প্রচার কার্যক্রম পরিচলনার জন্য স্যাটেলাইট ভাড়া করে থাকে। বিবিসি এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ প্রায় ৩৮টি টিভি চ্যানেল ও বাংলাদেশ বেতার, ডিটিএইচ অপারেটর ‘আকাশ’ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ১ ব্যবহার করছে। 

 

বাংলাদেশের  দুটি ব্যাংক এই স্যাটেলাইট সেবা ব্যবহার করে তাদের এটিএমন সেবা দিতে শুরু করছে। তাছাড়া সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনীসহ বিভিন্ন সংস্থা এই স্যাটেলাইট সেবা ব্যবহার করার ব্যাপারে সমঝোতা স্মারক সাক্ষর হয়েছে। 

 

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটটি দূর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ব্যাপকভাবে সহায়তা করছে। আপনি নিশ্চয় একটা বিষয় লক্ষ করছেন যে বিভিন্ন দূর্যোগের খবর আমরা কয়েকদিন আগেই পেয়ে যাই। কয়েকদিন আগেই আবহাওয়া অধিদপ্তর আমাদের বলে অমুক ঘুর্ণিঝড় আসতেছে। পরবর্তীতে তারা সতর্কসংকেত এর মাধ্যমে জনসাধারণকে সচেতন করতে পারে।

 

 

 

দেশের বাহিরে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট এর ব্যবহার

এটা আমাদের জন্য খুবই ভালো একটি খবর যে বর্তমানে শুধু বাংলাদেশই নয় বরং বাংলাদেশের বাহিরেও বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশ্বের কয়েকটি দেশের মিডিয়া সংস্থা বর্তমানে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট থেকে ভাড়া করা ট্রান্সপন্ডার ব্যভহার করছে। এগুলি নিচে উল্লেখ করা হলো:

  • তুরস্ক: ১টি বেসরকারি টিভি চ্যানেল কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ব্যবহার করে।

  • ঘানা: ২টি টিভি চ্যানেলের ক্ষেত্রে ব্যবহার করে ও আরো একটি সম্প্রচারণের অপেক্ষায় রয়েছে। 

  • ক্যামেরুন: ১টি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের ক্ষেত্রে ব্যবহার করে।

  • হনডুরাস: ২টি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের জন্য ব্যবহার করে।

দক্ষিণ আফ্রিকা: ২টি অনলাইন ভিত্তিক টিভি চ্যানেলের জন্য ব্যবহার করে।

পরিশেষে

পরিশেষে বলা যায় বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ১ বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন। আশা করা যায় এটি ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এবং সর্বপরি দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। যেকোনো প্রয়োজনে আমাদের সাথে যোগাযোগ  করতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *