বই রিভিউ

মেঘে ঢাকা জোছনা প্যারাসাইকোলজি থ্রিলার বই রিভিউ

আপনারা যারা প্যারাসাইকোলজি থ্রিলার বই পছন্দ করেন তাদের জন্য অসাধারণ একটি বই হবে মেঘে ঢাকা জোছনা বইটি। এমনকি যারা এ ধরনের বই পছন্দ করেননা তারাও একবার পড়া শুরু করলে না শেষ করে উঠতে পারবেন না আশা করি। লেখক মোশতাক আহমেদ যেন তার সবটুকু দিয়ে এই বইটি লিখেছে। আমি এ পর্যন্ত দুইবার বইটি পড়েছি। যখনই বইটি পড়া শুরু করেছি শেষ না করে যেন উঠতেই পারিনি। 

 

আসলে আমরা অনেকেই মনে করে থাকি যে গল্প উপন্যাস পড়া আসলে সময়ের অপচয়, এখানে শেখার কিছু নেই। আমি বলবো আসলে এই ধারণাটা ঠিক না। এই উপন্যাসেও শেখার অনেক কিছু আছে।

 

লেখক পরিচিতি

আধুনিক একজন লেখক মোশতাক আহমেদ। জন্ম ৩০ ডিসেম্বর ১৯৭৫ সাল ফরিদপুর জেলা। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসী ডিপার্টমেন্ট হতে এম ফার্ম ডিগ্রী অর্জন করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ হতে এমবিএ এবং ইংল্যান্ডের লেস্টার ইউনিভার্সিটি থেকে ক্রিমিনোলোজিতে মাস্টার্স ডিগ্রী লাভ করেন।

 

কর্ম জীবনে তিনি একজন চাকুরীজীবি। তাঁর লেখালেখির শুরু ছাত্রজীবন থেকেই। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীতে তিনি অধিক আগ্রহী হলেও গোয়েন্দা এবং ভৌতিক ক্ষেত্রে যথেষ্ট পারদর্শীতার পরিচয় দিয়েছেন। তার উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে-রেটিজম, ক্লিটি ভাইরাস, নিহির ভালবাসা, অতৃপ্ত আত্না, নীল মৃত্যু, জকি, মীম, প্রেতাত্মা,পোইথিন, শিশিলিন ইত্যাদি। 

 

সায়েন্স ফিকশন সিরিজ- রিবিট, কালোমানুষ, রিবিট এবং ওরা, রিবিটের দুঃখ, শান্তিতে রিবিট, হিমালয়ে রিবিট। প্যারাসাইকোলজি- মায়াবী জোছনার বসন্তে, জোছনা রাতের জোনাকি ইত্যাদি। 


ভ্রমণ উপন্যাস-বসন্ত বর্ষার দিগন্ত, লাল ডায়েরি, জকি। স্মৃতিকথা- এক ঝলক কিংবদন্তী হুমায়ূন আহমেদ। মুক্তিযুদ্ধ- নক্ষত্রের রাজারবাগ, মুক্তিযোদ্ধা রতন। তিনি কালি কলম সাহিত্য পুরষ্কার ২০১৩, ছোটদে মেলা সাহিত্য পুরষ্কার ২০১৪, কৃষ্ণকলি সাহিত্য পুরষ্কার ২০১৪ পুরষ্কার পেয়েছেন।

 

মেঘে ঢাকা জোছনা উপন্যাসের কাহিনী সংক্ষেপ

রিতিশা আর রাহাত দুজন দুজনকে অনেক ভালোবাসে। এক সকালে রাহাতের একটি ফোন এলো রিতিশার কাছে।ফোনে রাহাত বললো একটি বিপদে পড়েছে সে, তাদের বাসার যে কাজের মেয়েটা থাকতো সে খুন হয়েছে। রিতিশা তৎক্ষণাৎ রাহাতদের বাসায় গিয়ে দেখলো বাসার সামনে অনেক মানুষ জড়ো হয়ে আছে। যে রুমটাতে মেয়েটি খুন হয়েছে সেই রুমে উঁকি দিয়ে দেখলো মেয়েটির শরীর দরড়ার আরেক পাল্লার সাথে হেলান দেওয়া অবস্থায় রয়েছে। দুই হাত দুই পাশে রক্তাক্ত। মুখটা গামছা দিয়ে শক্তভাবে বাঁধা। বাম পায়ের হাঁটুর ওপরের থাইতে মাংস অনেকখানি কাটা। পা বিচ্ছিন্ন হয়নি, তবে হাড় পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। এদিকে বাড়িতে থাকতো শুধু রাহাত আর তার মা আবার বাড়ির মূল দড়জাও বন্ধ ছিলো। 

 

আর এই খুনের জন্য রাহাত গ্রেফতার হলো। রিতিশা রাহাতের জন্য আইনি লড়াই শুরু করলেন। কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে ততই যেন তার কাছে মামলাটা কঠিন হয়ে যাচ্ছিলো। সে নিজেও মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ে। একটা সময়ে দেখা হয় মানসিক বিশেষজ্ঞ ডাক্তার তরফদারের সাথে। রিতিশার মানসিক সুস্থতার জন্য রিতিশার বাবা ডাক্তার তরফদারকে দায়িত্ব দেন।  ডাক্তার তরফদার রিতিশার সুস্থ্যতার জন্য চিকিৎসা শুরু করলেন, চিকিৎসার এক পর্যায়ে রাহাতের মামলার তদন্তে জড়িয়ে পড়লেন। 

 

শুরু হলো তদন্ত কর্মকর্তা আর ডাক্তার তরফদারের যৌথ উদ্যেগে খুনের রহস্যভেদ করার অভিযান। একটা একটা করে রহস্যের জট খুলতে থাকেন তিনি। মানসিক চিকিৎসার পাশাপাশি অশরীরীয় শক্তি খুঁজতে গিয়ে এবার তিনি হয়ে ওঠেন প্যারাসাইকোলজিক্যাল ইনভেস্টিগেটর। শেষ পর্যন্ত কী ডাক্তার তরফদার লাবনীর প্রকৃত খুনীকে সনাক্ত করতে পেরেছিলেন? আর কী বা ঘটেছিলো রিতিশার জীবনে? সে কি পুনরায় ফিরে পেয়েছিলো রাহাতকে? বাধতে পেরেছিলো তার স্বপ্নের সংসার? 

 

মেঘে ঢাকা জোছনা উপন্যাসের শেষটি এককথায় অসাধারণ, সেই সাথে শিক্ষনীয়ও। আপনি যদি মেঘে ঢাকা জোছনা বইটি পড়েন তাহলে সময় বিফলে যাবেনা আশা করছি।

 

উপন্যাসে লজ্জাবতি গাছ সম্পর্কে কিছু কথা

লজ্জাবতী গাছের পাতার গোড়াগুলো ফোলা থাকে। কিছু বড়ো বড়ো কোষ রয়েছে এই ফোলা জায়গায়। প্রত্যেকটি কোষ থাকে পানিভরতি। পানিভরতি অবস্থায় ডাঁটা এবং পাতাগুলো সোজা থাকে। হঠাৎ পাতা স্পর্শ করলে ‘অ্যাসিটাইল কোলিন’ নামক রাসায়নিক পদার্থের মাধ্যমে একটা বিদুৎপ্রবাহ সম্পূর্ণ গাছে ছড়িয়ে পড়ে এবং গোড়ার কোষের পানি-সহ খনিজ লবণ এক কোষ থেকে অন্য কোষে যেতে থাকে। এতে কোষগুলো চুসে যায় এবং চাপ কমে গিয়ে পাতার ডাঁটা সোজা থাকতে পারে না, সংকুচিত হয়। 

 

এই উপন্যাসে মূল চরিত্রের বাইরে থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্রে ছিলো গাছমানব। লেখক এই মেঘে ঢাকা জোছনা উপন্যাসে গাছমানবের দ্বারা সমাজে সুন্দর একটি বার্তাও দিয়েছেন।

 

মেঘে ঢাকা জোছনা বই সম্পর্কে লেখকের কথা

মোশতাক আহমেদ তার এই মেঘে ঢাকা জোছনা সম্পর্কে বলেছেন। আমি এক নেশায় বুঁদ হয়ে আছি। আর তা হলো প্যারাসাইকোলজি উপন্যাস লেখার নেশা। মনে হয় সারাদিন লিখি। কিন্তু নানা ব্যস্ততায় হয়ে ওঠে না। যদি দূরে কোথাও গিয়ে একটানা কিছুদিন প্যারাসাইকোলজি উপন্যাস লিখতে পারতাম মনে বড়ো আনন্দ পেতাম। এই মেঘে ঢাকা জোছনা উপন্যাসটি লেখার সময় আমি এতটাই নেশাগ্রস্ত ছিলাম যে ১৪ই মে ২০২১, শুক্রবার, পবিত্র ঈদ-উল-ফিতরের দিনও লিখেছি। অনুধাবন করছি, লেকার এই নেশা আমাাকে অসুস্থ করে তুলছে। তাই ভাবছি একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেব, অন্তত আরোও কিছুদিন হলেও যে আমাকে বাঁচতে হবে। 

 

বইয়ের নামঃ মেঘে ঢাকা জোছনা

লেখকের নামঃ মোশতাক আহমেদ

প্রকাশকঃ অনিন্দ্য প্রকাশ

প্রথম প্রকাশ কালঃ জুন, ২০২১

চতুর্থ প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ২০২১ (যেটা অনুযায়ী রিভিউ করা হয়েছে)

প্রচ্ছদঃ জয় কর্মকার

পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ১৬০

মূল্যঃ ৩০০ টাকা (বর্তমান অফারমূল্য ২৮০)

ISBN: 978 984 95441 3 5

ব্যক্তিগত রেটিংঃ ৪.৫/৫

 

প্রাপ্তিস্থান: রকমারি.কম



রকমারি থেকে প্রাপ্ত কিছু পাঠকের মতামত মেঘে ঢাকা জোছনা বইটি সম্পর্কে

মন্তব্য ১: বইটি পড়ে যেমন প্যারাসাইকোলজির স্বাদ পেয়েছি তেমনি বৃক্ষ রোপনের জন্য উদ্বুদ্ধ হয়েছি। এখানে প্যারা সাইকোলজি অংশের চেয়ে আমার বেশি ভালো লেগেছে গাছ মানবের অংশটি। যা দ্বারা লেখব সকলকে কে গাছের প্রতি যত্নশীল হওয়ার আহবান জানিয়েছেন। 

 

মন্তব্য ২: অসাধারণ লেখনি। এতো সুন্দর লিখা যে আমাকে মাতিয়ে তুলেছে। একজন লেখকের লিখা তখনি স্বার্থক হয় যখন পাঠক গল্পের চরিত্রে নিজেকে আবিষ্কার করে যা আমার বেলায় হয়েছে। 


মন্তব্য ৩: খুব খুব খুবই সুন্দর, পড়ার পরে মনটা ভালো হয়ে গিয়েছে।

 

পরিশেষে

মেঘে ঢাকা জোছনা উপন্যাসটি ছিলো আমার পড়া সেরা বইগুলির মধ্যে একটি। বইটিতে যেমন থ্রিলার ছিলো তেমনি শিক্ষনীয় বিষয়ও ছিলো। আপনারা নিকটস্থ বইয়ের দোকান বা রকমারি থেকে অর্ডার দিয়ে বইটি পড়ে দেখতে পারেন। যে কোনো প্রয়োজনে আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *