ইন্টারনেট

সাবমেরিন ক্যাবল কি? বাংলাদেশে ব্যবহৃত সাবমেরিন ক্যাবল

বিটিআরসি এর একটি তথ্যমতে, ২০২৪ এর মে পর্যন্ত বাংলাদেশে মোট ইন্টারনেট গ্রাহক প্রায় ১৪কোটির মত। এখানে অবশ্য ব্রডব্যান্ড এবং মোবাইল ইন্টারনেট উভয় ব্যবহারকারীই রয়েছে। আমরা এই ইন্টারনেট পেয়ে থাকি সমুদ্রের নিচ দিয়ে আসা সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা সাবমেরিন ক্যাবল কি এই সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করবো।

 

সাবমেরিন ক্যাবল কি

সাবমেরিন ক্যাবল হলো সমুদ্রের নিচ দিয়ে আসা একধরনের অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল, যা বিভিন্ন দেশের ল্যান্ডিং পয়েন্টের সাথে যুক্ত থাকে। আমাদের মধ্যে একটি ভুল ধারণা হলো, আমরা মনে করি প্রায় সকল যোগাযোগ বা ইন্টারনেটই আমরা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে করে থাকি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে প্রায় ৯৫ শতাংশেরও বেশি আন্তর্জাতিক ডাটা এবং ভয়েস ট্রান্সফার হয়ে থাকে অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবলের মাধ্যমে।

 

সাবমেরিন ক্যাবল এর আবিষ্কার

প্রথমদিকের সাবমেরিনগুলি টেলিগ্রাফিক ডাটা বহন করতো। প্রথমবার সফলভাবে সাবমেরিনে ডাটা ট্রান্সফার করা হয় আটলান্টিক মহাসাগরের মধ্যে স্থাপন করা সাবমেরিন দিয়ে। এটি ১৮৬৬ সালে চালু হয়েছিলো। প্রতি মিনিটে প্রায় ১২টি টেলিগ্রাফ ডাটা ট্রান্সফার করা যেত। 

 

প্রযুক্তির উন্নতির ফলে পরবর্তীতে দ্রুত গতির সাবমেরিন ক্যাবল তৈরি কর হয়েছে। ১৯৫৬ সালের সেপ্টেম্বরে সাবমেরিন কোঅক্সিয়াল টেলিফোন যোগাযোগ শুরু হয়। অবশেষে ১৯৮৮ সালে ফাইবার অপটিক ক্যাবল ইনস্টল করা হয় এবং এটি যুক্তরাষ্ট, যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্সকে সংযুক্ত করে। 

 

সাবমেরিন ক্যাবল সমুদ্র দিয়েই নেওয়া হয় কেন

এই প্রশ্নটা অনেকের মধ্যেই আসতে পারে যে সাবমেরিন ক্যাবল সমুদ্রের মধ্য দিয়েই নেওয়া হয় কেন। যেহেতু এর উদ্দেশ্য হলো সারা দেশে নিরবিচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপন করা। আর এটা যদি আকাশ পথে নেওয়া হত তবে এর খরচ অনেক বেড়ে যেত। পোল স্থাপন বা বিভিন্ন জায়গায় ব্রিজ স্থাপন করে তারপরেই এটা নেওয়া যেত। যা ছিলো আসলেও অনেক কষ্টকর।

 

সাবমেরিন ক্যাবলগুলি সমুদ্রের মধ্যে কিভাবে থাকে

ক্যাবলগুলি সাধারণত সমুদ্রের পানির নিচ দিয়ে এবং সমুদ্রের তলদেশের উপর দিয়ে নেওয়া হয়ে থাকে। তবে সমুদ্রের তীরের কাছাকাছি জায়গায় এটি সমুদ্রের তলদেশের ভিতর দিয়ে অর্থাৎ মাটির মধ্যে দিয়ে নেওয়া হয়। এ কারণে আপনি যদি সমুদ্র তীরে যান তবে সাবমেরিন ক্যাবল দেখতে পাবেন না। 

 

ক্যাবলটি নেওয়ার সময় নিরাপদ জায়গা দেখে নেওয়া হয়। বিশেষ করে বিভিন্ন ধরনের ফল্ট জোন, ফিসিং জোন এবং বিপদজনক জায়গাগুলিকে এরিয়ে চলা হয়। 

 

সমুদ্রের মধ্যে কি পরিমাণ সাবমেরিন ক্যাবল রয়েছে

বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায় ২০২৪ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত প্রায় ১.৪ মিলিয়ন কিলোমিটার সাবমেরিন ক্যাবল সমুদ্রের মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে কিছু ক্যাবল আছে অনেক ছোট যেমন আয়ারল্যান্ড এবং যুক্তরাজ্যের মধ্যে মাত্র ১৩১ কিলোমিটার ক্যাবলের একটি সাবমেরিন সংযোগ রয়েছে। 

 

আবার কিছু ক্যাবল রয়েছে যেগুলো অনেক দীর্ঘ যেমন এশিয়া আমেরিকা গেটওয়ে সাবমেরিন ক্যাবল। এর দৈর্ঘ প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার।

 

কারা সাবমেরিন ক্যাবল ব্যবহার করে

সাবমেরিন ক্যাবল কি এ সম্পর্কে জানতে গেলে আপনাকে জানতে হবে এটি আসলে কারা ব্যবহার করে। আপনি নিজেও কিন্তু সাবমেরিন ক্যাবল ব্যবহার করেন। অবাক হলেও এটাই সত্য। আমরা যেসব ওয়েবসাইট ভিজিট করি তার বেশিরভাগই আমেরিকা, সিঙ্গাপুর বা বিভিন্ন জায়গায় হোস্ট করা থাকে। আমরা যখন গুগলে কোনকিছু লিখে সার্চ করি তখন আমাদের রিকুয়েস্টটি সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে নির্দিষ্ট দেশের হোস্ট এ গিয়ে পৌছায়। 

 

টেলিকম ক্যারিয়ার, মাল্টিন্যাশনাল অপারেটর, মোবাইল অপারেটর, গভরমেন্ট, কনটেন্ট প্রোভাইডার এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলি বিশ্বজুড়ে ডাটা পাঠানোর জন্য সাবমেরিন ক্যাবলের উপর নির্ভর করে থাকে। 

 

এটা এভাবেও বলা যায় যে, আপনি যদি মোবাইল ব্যবহার করে থাকেন আর আপনার  কাছে যদি ইন্টারনেট থাকে তাহলে আপনিও সাবমেরিন ক্যাবলের সাথে যুক্ত আছেন।

 

সাবমেরিন ক্যাবল বাংলাদেশ

অনেক প্রতিক্ষার পর অবশেষে বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলের সাথে যুক্ত হয় ২০০৬ সালে। এবং ২০০৮ সালে বাংলাদেশ ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের যুগে প্রবেশ করে। দুইটি সাবমেরিন ক্যাবলের বাংলাদেশে সাথে সংযুক্ত হয় সেই দুইটি হলো SEA-ME-WE 4 এবং SEA-ME-WE 5।  

 

সরকার ২০০৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণ করার পরে দেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশে রূপান্তর করার কর্মসূচি গ্রহন করে। আর এই ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তেই শুরু থেকেই সাবমেরিন ক্যাবল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। 

 

বাংলাদেশ যদি সাবমেরিন ক্যাবলের সাথে সংযুক্ত না হতো তাহলে হয়তো আমরা এত এত ইন্টারনেট সবাই ব্যবহার করতে পারতাম না। সবার হাতে হাতে ইন্টারনেট বা ঘরে ঘরে ইন্টারনেটও সবাই ব্যবহার করতে পারতাম না। 

 

প্রথম একটি সাবমেরিন দিয়ে শুরু হলেও এটি বাংলাদেশের জন্য ঝুকিপূর্ণ হয়ে যায়। এজন্য পরবর্তীতে বাংলাদেশ SEA-ME-WE 5 সাবমেরিনের সাথে যুক্ত হয়।

 

বাংলাদেশের সাবমেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশন কয়টি

বর্তমানে বাংলাদেশে দুটি সাবমেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশন রয়েছে। দুটি আলাদা আলাদা সাবমেরিন ক্যাবলের জন্য দুটি আলাদা আলাদা ল্যান্ডিং স্টেশন রয়েছে। 

 

SEA-ME-WE 4 সাবমেরিন ক্যাবলের স্টেশন রয়েছে কক্সবাজারের ঝিলংজাতে। এবং SEA-ME-WE 5 ক্যাবলের স্টেশন রয়েছে পটুয়াখালির কুয়াকাটাতে। SEA-ME-WE 5 ক্যাবলটি ১৯ টি দেশের টেলিযোগাযোগ সংস্থার সম্মেলনে গঠিত।

 

সাবমেরিন ক্যাবল কি পরিমাণ ডাটা ট্রান্সফার করতে পারে

আমরা জানি ক্যাবলের ডাটা ট্রান্সফার ক্ষমতা প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হয়। সাবমেরিন ক্যাবল কি এ সম্পর্কে জানার জন্য এর ডাটা ট্রান্সফার ক্ষমতা সম্পর্কেও আমাদের জানতে হবে। সাধারণত ক্যাবলগুলি এখন ১৫ বছর আগের চেয়ে অনেক বেশি ডাটা ট্রান্সফার করতে পারে। যেমন নতুন MAREA ক্যাবল 224 Tbps পর্যন্ত ডাটা ট্রান্সফার করতে পারে। [1]

 

একটি ক্যাবলের ক্যাপাসিটি পরিমাপ করার জন্য দুটি প্রধান উপায় রয়েছে। 

 

Potential capacity: পটেনশিয়াল ক্যাপাসিটি হলো মোট ক্যাপাসিটির পরিমাপ যা ক্যাবলের মালিক ক্যাবলের শেষ পয়েন্টে অ্যাভেইলেবল ইকুইপমেন্ট  ইনস্টল করতে পারে। 


Lit capacity: লিট ক্যাপাসিটি হলো একটি ক্যাবলের মধ্যে দিয়ে ট্রান্সফার হওয়া মোট ক্যাপাসিটির পরিমাণ। এই ক্যাবল অনেকটা ব্যয়বহুল, তাই গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী ক্যাবল মালিকরা ধীরে ধীরে ক্যাবল আপগ্রেড করে থাকে।

 

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কেন স্যাটেলাইটের পরিবর্তে ক্যাবল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে

স্যাটেলাইট আসলে কিছু কিছু অ্যাপ্লিকেশনের জন্য সত্যিই দুর্দান্ত। এখনও স্যাটেলাইট এমন কিছু জায়গায় কাজ করে যেখানে ফাইবার ক্যাবল এখনও যুক্ত হতে পারেনি। এটি একটি কনটেন্ট কে একটি উৎস থেকে একাধিক স্থানে বিতরণের জন্যও ব্যাপক কার্যকর। 

 

তবে সাবমেরিন ক্যাবলের বড় একটি সুবিধা হলো এটি স্যাটেলাইটের চেয়ে অনেক কম খরচে অনেক বেশি ডাটা বহন করতে পারে। সমন্ত ইন্টারনেট জগতের মধ্যে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ঠিক কতটা ডাটা বহন করা হয় তা জানা কঠিন। তবে এটি খুব স্বল্প পরিমাণে হবে তা বলাই যায়।

 

মোবাইল ইন্টারনেট কিভাবে ব্যবহৃত হয়

এখন একটা প্রশ্ন আসতে পারে আমাদের মোবাইল ফোন তো আর কোনো ক্যাবলের সাথে যুক্ত না। তাহলে মোবাইলের মাধ্যমে আমরা কিভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করি। এরও একটি উত্তর রয়েছে, এর কারণ হলো:

 

আমরা মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহার করার সময় শুধুমাত্র মোবাইল থেকে নিকটস্থ টাওয়ার পর্যন্ত ওয়্যারলেস সিগন্যালের মাধ্যমে ডাটা ট্রান্সফার হয়। পরবর্তীতে সেখান থেকে subsea ফাইবার ক্যাবলের মাধ্যমে ডাটা ট্রান্সফার হয়ে থাকে।

 

সাবমেরিন ক্যাবল কি কখনো ক্ষতিগ্রস্থ হয়

হ্যাঁ, এই ক্যাবলও ক্ষতিগ্রস্থ বা কাটা পড়া স্বাভাবিক ঘটনা। যা গড়ে প্রতি বছর ১০০বারের চেয়েও বেশি হয়। এমনি একটি সংবাদ গত ২৭ এপ্রিল দৈনিক ইনকিলাব প্রত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিলো। 

 

তবে এই ক্যাবলগুলি ক্ষতিগ্রস্থ হলেও আমরা খুবই এটি সম্পর্কে জানতে পারি। কেননা বাংলাদেশে বর্তমানে দুটি সাবমেরিন ক্যাবল রয়েছে তাই একটি যদি অকার্যকর হয়ে যায় অন্যটি দিয়ে কাজ চালিয়ে নেওয়া যায়। হয়তো ইন্টারনেট একটু স্লো হয় কিন্তু সবাই এটি হয়তো বুঝতে পারেনা। 

 

তবে যে সব কারণে ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্থ হয় তার মধ্যে দুই তৃতীয়াংশই হলো মাছ ধরার জাহাজ এবং অন্যান্য জাহাজের নোঙ্গর টেনে নেওয়ার জন্য।

 

পরিশেষে

সাবমেরিন ক্যাবল প্রযুক্তি অনেক আগের হলেও এর ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে, এবং ভবিষৎতেও বাড়বে। পূর্বে যেখানে একজন কে একটি চিঠি লিখে খবর পাঠানো লাগতো যাতে সময় লাগতো কয়েকদিন। এখন সেখানে সেকেন্ডের মধ্যেই তাকে খবর দেওয়া যায়।  

আশা করি উপরক্ত আর্টিকেল থেকে সাবমেরিন ক্যাবল কি এই সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পেরেছেন। সাবমেরিন ক্যাবল সম্পর্কে আরো কিছু জানতে চাইলে কমেন্ট করতে পারেন অথবা আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন।

 

রেফারেন্স

“Submarine Cable FAQs.” TeleGeography, https://www2.telegeography.com/submarine-cable-faqs-frequently-asked-questions. Accessed 8 July 2024.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *